ফরাসী বুননজাদুকরদের গল্প।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন বলা হলো আমরা প্যারিসে যাচ্ছি  টেক্সটাইলের অন্যাতম  বড় মেলা প্রিমিয়ার ভিশন পরিদর্শনে তখন থেকেই মনের ভিতর একটা সুপ্ত বাসনা ছিলো যদি একবার ফরাসিদের  ঐতিহ্যবাহী ট্যাপেষ্ট্রি (মাদুর) কারখানা  ঘুরে আসতে পারতাম। শিল্প সাহিত্যের রাজধানী প্যারিসে কিছু দূর পর পর দেখা মিলে ভিবিন্ন জাদুঘরের। তৎকালীন ফরাসী অভিজাতদের  নিয়ে আকা ভিবিন্ন চিত্রকর্মে দেখা যায়  নানা নকশার  ট্যাপেষ্ট্রি (মাদুর)।

বস্র শিল্পে পড়াশুনায় থাকায় এর প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো অনেক আগ থেকেই।  অবশেষে  সুযোগ মিলে। টেক্সটাইল বিভাগের প্রফেসর এন্ড্রে রিশেলের সাথে যাওয়া হয় জাদুর কারখানা ম্যানুফেকচার অব দ্যা গোব্লা।
১৪০০ খিস্ট্রাব্ধে  জ্য গোব্লা  (Jean Gobelin)  বিয়েভ্রা ( Bièvre) নদীর তীরে গড়ে তুলেন প্রথম  ট্যাপেষ্ট্রি  কারখানা।  গোব্লা’সের সুনিপুণ কারিগরি দক্ষতা এবং রঙের ব্যাবহার অল্পদিনেই শিল্প প্রিয় অভিজাত ফরাসীদের নজরে আসে। গোব্লা’সের জনপ্রিয়তায় বিয়েভ্রা নদী পরিচিতি পায়  রিভিয়া দ্য গোব্লা নামে।

তৎকালীন ফরাসী  রাজ্যে  শিল্প সাহিত্যের প্রসারের  এক  মহাযুগ চলছিলো। গোব্লা’সের  সুনাম আর  নাম ডাক ছড়ায়  রাজ দরবারেও।  ১৬৬৬ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার কিনে নেয় ম্যানুফেকচার অব দ্যা গোব্লা। এবং প্রতিষ্ঠা করেন  Manufacture Royale des Meubles et Tapis de la Couronne- Royal Manufacture of furniture of the Crown.  মূলত সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত গোব্লা’সে শুধুমাত্র  রাজ প্রসাদের  জন্যই  ট্যাপেষ্ট্রি (মাদুর)  উৎপাদন করা হয়।  ফ্রেন্স রেভুলশনের সময় অন্যান্য বিখ্যাত স্থাপনার মত গোব্লাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পুড়ে যায় মূল্যবান সব  ট্যাপেষ্ট্রি (মাদুর)। ১৮২৫ সালে Manufacture de la Savonnerie de Lodève  কিনে নেয় গোব্লা। পরবর্তীতে রাজনিতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে  গোব্লা’সের মালিকানা ও পরিবর্তন হয় অনেকবার। ফ্রান্সের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়  মবিলিয়া ন্যাশনাল।  মুলুত  The Manufacture des Gobelins, Manufacture Nationale de la Savonnerie de Lodève এবং the Ateliers Nationaux de Dentelle du Puy et d’Alençon এই তিনটি কারখানা নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। মবিলিয়া ন্যাশনাল কিছু প্রদক্ষেপ নেয় যার মধ্যে  বিংশ শতাব্দীর  জনপ্রিয় চিত্র শিল্পীদের  মাস্টারপিচগুলোকে টেপিস্ট্রিতে রূপ দেওয়া। এর মধ্য শ্যগল (Chagall) পিকাসো (Picasso)  ম্যাতিস (Matisse) মিরো (Miro) এবং জো লুরসা (Jean Lurçat) এর মত বিখ্যাত শিল্পীদের কর্ম রয়েছে।

প্রতিবছর  বিশ্বের  নাম করা চিত্র শিল্পীরা তাদের চিত্রকর্ম নিয়ে আসে গোব্লাসে। পরিচালক বোর্ড  কড়া গোপনীয়তায় নির্বাচন করেন অল্প কয়েকটি  চিত্রকর্ম। যেগুলো পরবর্তীতে উৎপাদনে যায়। একটি মোটামুটি সাইজের টেপিস্ট্রি উৎপাদনে সময় লাগে প্রায় ৪ থেকে ৬ বছর। এখানকার কারিগররা সরকারী অধিভুক্ত। একমাত্র দক্ষতা  এবং শৈল্পিক দূরদর্শিতা থাকলেই বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে অল্প সংখ্যক  ছাত্র ছাত্রী চার বছর প্রশিক্ষণের  জন্য নির্বাচিত হন। যারা পরবর্তীতে কারিগর হিসাবে নিয়োগ পান। গোব্লা’সের ডাইয়িং সেকশনে এখন পর্যন্ত রয়েছে ২৪ হাজার  রঙের রেসিপি  আর  নিয়মিত নতুন নতুন রং এর আবিষ্কার তো  হচ্ছেই। চিত্রশিল্পীর তুলির আঁচড়ের প্রতিটি রং ই  সুনিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেন এই সুই সূতার কারিগররা। একজন বয়স্ক কারিগরকে জিজ্ঞসা করেছিলাম আজ পর্যন্ত আপনি কতটি টেপিস্ট্রি বানিয়েছেন?  উনি হেসে দিয়ে বললেন  পাঁচ থেকে ছয়টি। চরম ধৈর্যের সাথে বছরের পর বছর ধরে কাজ করতে হয়। প্রতিদিন ৭ ঘণ্টা কাজ করলে একজন কারিগর মানুষের হাতের তালু পরিমাণ জায়াগা বুনন করতে পারেন।

 

বিজ্ঞানের এই যুগে  প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা ফরাসীরা চাইলেই গোব্লাসকে  যান্ত্রিক রূপ দিয়ে সময়  এবং খরচ কমাতে পারে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে শিল্প লালন করা জাতী এই ভুল করেনি।   অসাধারণ  ম্যানুফেকচার অব দ্যা গোব্লা  দ্যাখে বার বার ই মনে হচ্ছিলো, সরকারী প্রদক্ষেপ থাকলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিল্প গুলোকেও এভাবে রক্ষা করা যেতো।

লেখক –

মির্জা আহমেদ  মান্নান
ফ্যাশন ডিজাইনার
জার্মানি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.