বেসিক ফটোগ্রাফি -২ (ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ডিজিটাল ফটোগ্রাফির নানা বিষয়)

ডিজিটাল কামেরার প্রসারের সাথেসাথে ফটোগ্রাফি যেমন সহজ হয়েছে তেমনি জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। আজকাল অধিকাংশ উন্নত মানের মোবাইল ফোনেই ভাল মানের ছবি উঠানো যায়। সেইসাথে আগ্রহ বাড়লে অল্পদামেই কিনে ফেলা যায় ডিজিটাল ক্যামেরা।

c1dx01.jpg1c8fa765-7c47-4ac9-a082-a61331df5b0bOriginalএকবার ক্যামেরা কেনার পর ফিল্মের দিনের মত খরচ কিংবা ঝামেলা কোনটাই নেই।
ক্যামেরা ক্লিক করলে ছবি ওঠে। সব ছবি কি একরকম হয় ? কিংবা সবার উঠানো ছবি কি এক মানের হয় ?
নিশ্চয়ই না। কেউ ছবি উঠান শখ করে, কারো কাছে ফটোগ্রাফি নেশার মত, কারো জন্য পুরোপুরি পেশা। যাই হোক না কেন, ভাল ছবির সাথে সম্পর্ক ক্যামেরা এবং ফটোগ্রাফি সম্পর্কে জানা। ডিজিটাল ক্যামেরা এবং ফটোগ্রাফির সাধারন বিষয়গুলি সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

সেন্সর এবং আকার অনুযায়ী নানা ধরনের ক্যামেরা

ফিল্ম ক্যামেরায় যেমন ছবি উঠানো হয় ফিল্মে, ডিজিটাল ক্যামেরায় কাজটি করে সেন্সর নামের একটি ইলেকট্রনিক বস্তু। ক্যামেরা অনুযায়ী এটা আকারে বড়-ছোট হয়। সেন্সর যত বড় ছবি তত ভাল হবে এতে সন্দেহ করার কারন নেই। মোবাইল ফোনের সেন্সর ছোট, পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরায় তারথেকে বড়, প্রাথমিক (এন্ট্রি লেভেল) এলএলআর ক্যামেরায় তারথেকে বড়, মিডরেঞ্জ এসএলআর ক্যামেরায় তারথেকে বড়, প্রফেশনাল ক্যামেরায় তারথেকে বড়। সাধারনভাবে প্রফেশনাল ক্যামেরা ৩৫মিমি ফিল্মের সমান সেন্সর থাকে, ফলে তাতে ফিল্মের মানের কাছাকাছি মান পাওয়া যায়। এই সেন্সরকে ফুল-ফ্রেম বলে।

sensor-size-1

ফুলফ্রেম থেকেও বড় সেন্সরের ক্যামেরা রয়েছে। এগুলি ব্যবহার হয় বিশেষ কাজে বা অতি-পেশাদারী কাজে। এদের সম্পর্কে এরবেশি জানা হয়ত প্রয়োজন হবে না।
কাজেই, ক্যামেরার মানের বিচারে সবথেকে পিছিয়ে মোবাইল ফোন ক্যামেরা, যত প্রচার করাই হোক না কেন। যত মেগাপিক্সেলই হোক না কেন।
এর পরের ক্যামেরার নাম পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরা। সাধারনত এদের সেন্সরের মাপ ১/২.৩ ইঞ্চি। ক্যাননের পাওয়ারশট, নাইকনের কুলপিক্স, সনির সাইবারশট, প্যানাসনিক লুমিক্স ইত্যাদি এধরনের ক্যামেরা। আকারে এগুলি বুকপকেটে রাখার মত ছোট থেকে এসএলআরের মত বড় হতে পারে। অবশ্যই লেন্সের ক্ষমতা এবং অন্যান্য বিষয় অনুযায়ী আকার বড়-ছোট হয়।

Screen-shot-2013-01-31-at-7.45.19-PM
এন্ট্রি লেভেল এসএলআর ক্যামেরার সেন্সরকে বলা হয় মাইক্রো ফোর থার্ড সেন্সর। এই ক্যামেরাগুলির আকার কিছুটা বড়। এদের লেন্স পাল্টানো যায়। ক্যাননের ডিজিটাল রেবেল, নাইকনের ডি৩১০০, সনি আলফা এ৩৮০ ইত্যাদি এই ধরনের ক্যামেরা
91lIcinq-7L._SL1500_
মাইক্রো ফোর থার্ড সেন্সর ব্যবহার করে আরেক ধরনের ক্যামেরা তৈরী করা হয়। এতেও এসএলআরের মত লেন্স পাল্টানো যায়। পার্থক্য, এসএলআরের মত অপটিক্যাল ভিউফাইন্ডার নেই। ফলে আকারে ছোট হয়। প্যানাসনিক, অলিম্পাস, সনি এদের এধরনের ক্যামেরা রয়েছে।
মিডরেঞ্জ এসএলআর ক্যামেরাগুলি এন্ট্রি লেভেল থেকে উন্নত, সুবিধে বেশি, দাম বেশি। সেন্সর ছাড়াও আরো কিছু বিষয়ের পার্থক্য রয়েছে (আগামীতে উল্লেখ করা হবে) এই ক্যামেরাগুলিতে। ক্যাননের ৭ডি, নাইকনের ডি৯০ ইত্যাদি এই পর্যায়ের ক্যামেরা।
ফুলফ্রেম ক্যামেরাগুলিকে সরাসরি প্রফেশনাল ক্যামেরা বলা হয়। ক্যাননের ইওস মার্ক, নাইকনের ডি৭০০ ইত্যাদি এই পর্যায়ের ক্যামেরা।

মেগাপিক্সেল কি কাজ করে

ImageSizes

মেগা শব্দের অর্থ নিশ্চয়ই জানেন। ১ হাজারে ১ কিলো, ১ হাজার কিলোতে ১ মেগা। অর্থাৎ ১ মেগাপিক্সেল অর্থ যেখানে ১০ লক্ষ পিক্সেল রয়েছে। ক্যামেরায় যখন উল্লেখ করা হয় ৫ মেগাপিক্সেল তার অর্থ সেই ক্যামেরায় উঠানো ছবিতে ৫০ লক্ষ পিক্সেল থাকবে।
পিক্সেলকে পাশাপাশি বসানো ডটের সাথে তুলনা করুন। যত বেশি ডট বসানো হবে তত বেশি যায়গা প্রয়োজন হবে। কাজেই, মেগাপিক্সেল যত বেশি হবে ছবির আকার তত বড় হবে।
মেগাপিক্সেল সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারনা, সেটা বাড়লে ছবির মান ভাল হয়। আসলে ছবির মানের সাথে মেগাপিক্সেলের কোনই সম্পর্ক নেই। সাধারনভাবে ৮-১০ ইঞ্চি প্রিন্টের জন্য ৬ মেগাপিক্সেল সেন্সর যথেষ্ট। যারা বিশাল আকারের বিলবোর্ড তৈরীর জন্য ছবি উঠাবেন তাদের কথা আলাদা।

জুম আসলে কি ? কতটুকু প্রয়োজন ?
red-barn-sequence

ক্যামেরার লেন্সের সাথে জুম গুরুত্বপুর্ন একটি শব্দ। এথেকে জানা যায় আপনি কত দুরের ছবি উঠাতে পারবেন। হিসাব প্রকাশ করা হয় মিলিমিটারে। এর দুটি মান থাকে, কাছের মাপকে বলে ওয়াইড, দুরের মাপকে বলে টেলিফটো। ওয়াইড এঙ্গেলে সামনের দৃশ্যের বেশি অংশ দেখা যায়, টেলিফটোতে এই কোন ছোট হতে থাকে, ফলে ছোট একটি অংশ দেখা যায়। যেমন ২৫-২৫০মিমি, এর অর্থ ওয়াইড এঙ্গেলে ২৫ মিমি, টেলিফটোতে ২৫০ মিমি। একে ১০এক্স হিসেবে লেখা হতে পারে। এক্স অর্থ ওয়াইড এঙ্গেলের মানের গুনিতক। বর্তমানে ৩৫এক্স (৮৪০মিমি) পর্যন্ত পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরা রয়েছে (ক্যানন এসএক্স৩০আইএস)।

এতক্ষন যে জুমের কথা বলা হল সেকাজ করে লেন্স। এছাড়া ডিজিটাল জুম বলে আরেকটি বিষয় রয়েছে। সফটঅয়্যার এই কাজ করে। ভাল মানের ছবি পেতে চাইলে একে হিসেবের বাইরে রাখাই ভাল।

কতটুকু জুমের ক্যামেরা ব্যবহার করবেন সেটা নির্ভর করে ছবির ধরনের ওপর। যদি পাখির ছবি উঠানোর শখ থাকে তাহলে যত বেশি হয় ততই ভাল। যদি মুলত পারিবারিক, প্রকৃতি ইত্যাদির ছবি উঠানো প্রয়োজন হয় তাহলে তত জুম প্রয়োজন নেই। কাছে থেকে ফুলগাছের ছবি যত ভাল হবে, টেলিফটো ব্যবহার করে দুর থেকে তত ভাল ছবি পাওয়া যাবে না।

এসএলআর ক্যামেরাগুলিতে একটি লেন্স খুলে আরেকটি লাগানো যায়। সেকারনে ব্যবহারকারীরা ওয়াইড থেকে সুপার টেলিফটো পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের লেন্স ব্যবহার করেন। যত দুরের ছবি উঠাতে চান তত বেশে জুম প্রয়োজন (৩০০মিমি+)। সাধারন কাজের জন্য কমদামী এসএলআর ক্যামেরাগুলিতে ১৮-৫৫ মিমি লেন্স দেয়া হয় কিটলেন্স হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা বলেন ভাল পোর্ট্রেট এর জন্য প্রয়োজন ৮৫ মিমি। এজন্য ৮৫মিমি প্রাইম লেন্স পাওয়া যায়। কেউ আরো বাড়িয়ে ১৩৫মিমি কিংবা ২০০মিমি লেন্স ব্যবহার করেন।

কোন ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করবেন

ডিজিটাল ক্যামেরার বিভিন্ন বিষয়গুলি জেনেছেন। আপনি যদি ক্যামেরা কিনতে যান তাহলে কোন ধরনের ক্যামেরা কিনবেন ?

কেনার সাথে অবশ্যই দামের সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভব হলে যতটা সম্ভব বেশি দামের ক্যামেরা পছন্দ করতে পারেন। সাথে যে বিষয়গুলি বিবেচনা করবেন তা হচ্ছে,

ক্যামেরার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করুন। আপনি সবচেয়ে ভাল বিশাল আকারের ক্যামেরা কিনলেন অথচ বয়ে বেড়ানোর ভয়ে সেটা বাড়িতে রেখে বাইরে গেলেন। এমন অবস্থা নিশ্চয়ই চান না। সেক্ষেত্রে এমন ক্যামেরা বেছে নিন যা সবসময় পকেটে রাখা যাবে। পরিবারের ছবি, পিকনিকের ছবি উঠানোর জন্য সাধারন পয়েন্ট এন্ড শ্যুট ক্যামেরা যথেষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে এমন ভাল ক্যামেরা পাওয়া যায়।

বিভিন্ন যায়গা বেড়াতে গিয়ে ছবি উঠানো থেকে শুরু করে রীতিমত ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী হলে সুপারজুম ক্যামেরার দিকে যেতে পারে। ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় এমন ক্যামেরা পাওয়া যাবে।

আর পুরোপুরি ফটোগ্রাফার হতে চাইলে, সবচেয়ে ভাল মানের ছবি চাইলে অবশ্যই এসএলআর। প্রাথমিক মানের এসএলআর ৪০ হাজারের মধ্যে পাওয়া যাবে, মধ্যম মানের ক্যামেরা ১ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। তারচেয়ে ভাল ক্যামেরা যারা খোজ করেন তাদের হয়ত পরামর্শ প্রয়োজন নেই।

ভাল ক্যামেরার সাথে ভাল লেন্স, ইমেজ প্রসেসর ইত্যাদি আভ্যন্তরিন বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই খ্যাতিমান কোম্পানীর ক্যামেরা কেনা নিরাপদ। ক্যানন এবং নাইকন উন্নতমানের ক্যামেরা নির্মাতাদের মধ্যে সেরা। এর বাইরে সনি, প্যানাসনিক, ফুজিফিল্ম, স্যামসাং, পেনটাক্স এদের দিকে দৃষ্টি দিতে পারেন।

লেখক – Ak

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.